পটুয়াখালীর উপকূলীয় নদ-নদী ও অভয়াশ্রমগুলোতে অবৈধভাবে চিংড়ির রেনু আহরণের হিড়িক পড়েছে। এই অসাধু প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ চিংড়ির রেনু নিধনের পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের পোনা। এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে একদিকে যেমন দেশের মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে উপকূলীয় হ্যাচারি শিল্প।
সরেজমিনে দেখা যায়, কলাপাড়ার আন্ধারমানিক, সোনাতলা, শিববাড়িয়া নদীর মোহনা ও নিশানবাড়িয়া এলাকায় কিছু অসাধু জেলে অবৈধ নেট জাল (মশারি জাল) ব্যবহার করে রেনু সংগ্রহ করছে। স্থানীয়রা জানান, জেলেদের প্রলোভন দেখিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সংগৃহীত রেনু প্রতি পিস ১ থেকে ৩ টাকা দরে কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করা হচ্ছে।
কুয়াকাটার জননী গলদা চিংড়ি হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর শেখ বলেন, “সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র দিনের আলোতেই রেনু আহরণ করছে। হাজীপুরে কোস্টগার্ড স্টেশন থাকা সত্ত্বেও তাদের সামনে এই কর্মযজ্ঞ আমাদের হতাশ করে। মানহীন রেনু ব্যবহারের ফলে ঘের মালিকরা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন, যা প্রকারান্তরে জাতীয় অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়কে বাধাগ্রস্ত করছে।”
তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই অবৈধ ও মানহীন রেনু আহরণ এখনই বন্ধ না করা গেলে হ্যাচারি শিল্প টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা শুধু চিংড়ির উৎপাদনই নয়, পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করে তুলছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, “রেনু শিকারের সময় অসংখ্য প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর পোনা নষ্ট হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মৎস্যসম্পদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।”
স্থানীয় পর্যায়ে রেনু পাচার সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে দিদার উদ্দিন আহম্মেদ মাসুম ব্যাপারীর নাম শোনা গেলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে আর জড়িত নন। অন্যদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
দেশের রপ্তানি আয়, হ্যাচারি শিল্প এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্টরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন
উপকূলীয় এলাকায় মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল জোরদার করা।
আইনি পদক্ষেপ: অবৈধ মশারী জাল ও নেট জাল দিয়ে পোনা আহরণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
ভারত থেকে অবৈধ পথে রেনু প্রবেশ রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে উপকূলীয় মৎস্য খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।









