একই ইউনিয়নে দেশের দুটি বড় মেগা প্রকল্প—পায়রা ও পটুয়াখালী (আরপিসিএল) ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রকল্পের শুরুতে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের দেখানো হয়েছিল স্বাবলম্বী হওয়ার রঙিন স্বপ্ন, দেওয়া হয়েছিল ঘরে ঘরে চাকরির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। আজ মেগা প্রকল্পের আলোয় দেশ আলোকিত হলেও, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের জীবন কাটছে চরম অবহেলা, বেকারত্ব আর বঞ্চনায়।
এরই প্রতিবাদে এবং ৮ দফা দাবিতে এবার পায়রা ও আরপিসিএল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো একত্রিত হয়ে এক যৌথ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে।
বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের যাতায়াতের জন্য তৈরি হয়েছে ৬ লেনের পিচঢালা পথ ও কংক্রিটের আধুনিক রাস্তা। কিন্তু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঠিক পাশেই অবস্থিত মূল ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর উন্নয়ন হয়নি বিন্দু পরিমাণও।
দাশের হাওলা, মরিচবুনিয়া ও মধুপাড়া গ্রামের সবকটি রাস্তাই গত ৮ বছর ধরে চরম অবহেলিত এবং কাঁচা রয়ে গেছে।
আরপিসিএল এলাকা: গিলাতলা ও মধ্য লোন্দাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর অধিকাংশ রাস্তার অবস্থাও অত্যন্ত নাজেহাল ও কাঁচা।
”কর্তৃপক্ষের ঝলমলে রাস্তা দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, ভেতরের গ্রামগুলোর মানুষ কী নরকযাতনা ভোগ করছে। আমাদের জমি নিয়ে আমাদেরই খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে।”
— মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক ক্ষুব্ধ বাসিন্দা।
বন্ধ রাস্তা, মরণফাঁদ সেতু ও পরিবেশ বিপর্যয়
স্থানীয়দের আন্দোলনে উঠে এসেছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটির কারণে সৃষ্ট এ
আরপিসিএল কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ গায়ের জোরে মরিচবুনিয়া ও গন্ডাবাড়ি—এই দুটি গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় প্রতিনিধি দল বারবার আলোচনা করলেও কর্তৃপক্ষ রাস্তাটি খুলে দিতে নারাজ।
পায়রা ও আরপিসিএল-এর ভারী সিমেন্টের গাড়ি চলাচলের কারণে ধানখালীর কোডেক বাজারের একমাত্র সংযোগ সেতুটি ভেঙে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলেও সেতুটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যা এখন স্থানীয়দের জন্য এক ‘মরণফাঁদ’।
আরপিসিএল-এর বাঁধ ভেঙে বালু পড়ে ধানখালীর একমাত্র প্রাণভোমরা (মাছুয়াখালী স্লুইসগেট হয়ে সোমবারিয়া বাজার ও কোডেক বাজার হয়ে গিলাতলা) খালটি ভরাট হয়ে গেছে। এটি খননে কর্তৃপক্ষের কোনো আগ্রহ নেই। এছাড়া পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশে প্রায় ৬০০ একর জমি ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে পানিবন্দী হয়ে অনাবাদি পড়ে আছে।
স্বপ্নের ঠিকানায় শুধুই অনিশ্চয়তা মিলছে না দলিল
ভূমিহীন ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আবাসন প্রকল্প ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ এবং আরপিসিএল-এর ‘আনন্দপল্লী’ গড়ে তোলা হলেও, আজ পর্যন্ত পুনর্বাসিত পরিবারগুলো তাদের স্থায়ী মালিকানার দলিল পায়নি। কোন অদৃশ্য কারণে বা কেন তাদের দলিল দেওয়া হচ্ছে না, তা আজ ৮ বছরেও ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে এক অজানা রহস্য।
প্রতিশ্রুতি কেবলই ‘আন্দোলন দমনের কৌশল’
বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও শিক্ষিত বেকার যুবসমাজের ব্যানারে ৮ দফা দাবিতে দফায় দফায় আন্দোলন করা হয়েছিল। সে সময় কর্তৃপক্ষ দাবি মানার আশ্বাস দিলেও গত ২ বছরেও তার একটিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সেই প্রতিশ্রুতি ছিল মূলত আন্দোলন বন্ধ করার একটি অপকৌশল মাত্র।
কর্মসংস্থানের অভাবে এলাকার যুবসমাজ আজ চরম বেকারত্বের শিকার। যার অবক্ষয় হিসেবে এলাকায় চুরি, ডাকাতি ও মাদক কারবারিসহ নানা সামাজিক অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
সমাবেশে যারা বক্তব্য রাখেন
যৌথ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে সংহতি প্রকাশ করে এবং অনতিবিলম্বে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন
রবিউল আউয়াল অন্তর (সমন্বয়কারী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য)
নাছির তালুকদার (সাবেক ইউপি সদস্য)
বাচ্চু মৃধা (ইউপি সদস্য প্রার্থী)
শাহ আলম (ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য)
খবির খাঁ (ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য)
মাসুম বিল্লাহ (ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য)
কলি বেগম (ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য)
তানভীর (ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য)
মেহেদী হাসান (ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য)
মানববন্ধন থেকে বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবিলম্বে বন্ধ রাস্তা উন্মুক্ত করা, কোডেক বাজারের সেতু সংস্কার, আবাসন প্রকল্পের দলিল হস্তান্তর, বেকারদের কর্মসংস্থান এবং পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা না করা হলে আগামীতে আরও কঠোর ও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।










