সহজ-সরল ও সাদামনের মানুষ হাবিব হাওলাদার। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের সলিমপুর গ্রামে তার বসবাস। তবে নিজের কোনো জমি নেই; ঠাঁই নিয়েছেন বেড়িবাঁধের বাইরে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গায়। পেশায় তিনি কখনো কৃষক, কখনো দিনমজুর, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো জেলে। যখন যে কাজ পান, তা করেই চলে বেঁচে থাকার লড়াই। বাল্যকাল থেকেই হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন ৫০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ।
দাম্পত্য জীবনে তাঁর সঙ্গী ৪৫ বছর বয়সী হালিমা বেগম। একসাথে কাটিয়ে দিয়েছেন ৩০ বছরেরও বেশি সময়। দুজনের সংসার জীবনে ভালোবাসা থাকলেও শত চেষ্টা করেও তাঁরা স্বাবলম্বী হতে পারেননি। কোনোদিন ভালো খাবার, ভালো পোশাক কিংবা একটু আরামের বিছানায় ঘুমানোর ভাগ্য জোটেনি তাঁদের। টেনেটুনে চলছে অভাবের সংসার।
পলিথিন আর গোলপাতার ঝুপড়িতে বসবাস
বর্তমানে নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান হাবিব। এই বয়সেও স্বামীর কষ্ট কমাতে হাল ধরেছেন স্ত্রী হালিমা বেগম। দিনমজুর হাবিব বলেন, “সুহে (সুখে) থাহার লাইগ্গা আমি শুধু একলা না, আমার সাথে আমার স্ত্রী হালিমা বেগমও কাম করে। বর্তমানে আমি নদীতে মাছ ধরি, লগে হালিমাও যায়। সে আমার লগে জাল ফেলা থেকে শুরু কইরা মাছ বাছাই, জাল হুগানো (শুকানো) সব করে। শুধু এই ভাবি, যদি ভাগ্যের চাকা ঘূরাইতে পারি। কিন্তু হয় না।”
অশ্রুসিক্ত চোখে গামছায় চোখ মুছতে মুছতে তিনি আরও বলেন, “রোগ-শোক আর পোলা-মাইয়া, নাতি-নাতনির ঝামেলা মিটাইয়া হিসেবের খাতা শূন্য। হেইলইগ্গা থাকার ঘরডাও ভালোভাবে উডাইতে পারিনাই। বাধ্য হইয়া থাকি গোলপাতা ও পলিথিন দিয়া। শীতে কষ্ট পাই, বৃষ্টিতে ভিজি, আর বইন্নার (ঝড়ের) সময় ডর করে—ভাবি এই বুঝি ঘরডা উইড়া গেল! এহন একটু আরামে থাকতে একটা ভালো ঘর প্রয়োজন। কিন্তু স্বাদ আছে, সাধ্য নাই। সরকার ও বিত্তবানরা যদি একটু দয়া হরতেন, তবে বাকি জীবনটুকু শান্তিতে কাটাইতে পারতাম।”
‘নুন-পান্তা খাই, একটু শান্তিতে ঘুমাইতে চাই’
স্বামীর সংসারে এসে ভালোবাসার কমতি না থাকলেও অভাব দূর হয়নি হালিমার। দুঃখের স্মৃতি চারণ করে হালিমা বেগম বলেন, “স্বামীর সংসারে আইয়া তার ভালোবাসা পাইছি ঠিকই, এ্যাছাড়া আর কিছুই পাইনাই। না পারছি পেন্দনে (পড়নে) ভালো কাপড় পড়তে, না পারছি ভালো জিনিসটা খাইতে, না পারছি সুহের বিছানে ঘুমাইতে। জীবনডা গেল কষ্টে কষ্টে। তয় ও ব্যাডারে (স্বামীকে) আর কি কমু? চেষ্টা হরে কিন্তু পাইরা ওঠেনা। সব তো নিজের চোহের সামনে দেহি। এহন আল্লা ছাড়া আমাগো কেউ নাই। তয় মোগো ঘরটা যদি কেউ উডাইয়া দেতে, হেইলে নুন হউক আর পান্তা হউক—যা খাই না খাই, একটু শান্তিতে ঘুমাইতে পারতাম।”
প্রতিবেশী পারভিন বেগম এই দম্পতির কষ্টের কথা স্বীকার করে বলেন, “আসলেই তারা দুজন অনেক কষ্ট করেন। গরিব মানুষ, কাজকাম করে খায়। টাকা গুছাইয়া যে ঘরটা উঠাইবে, সেই সম্বল নাই। পোলাপান যারা আছে, তারাও গরিব। বিয়েশাদি করে দূরে থাকে। নিজেরা স্বাবলম্বী না হওয়ায় বাবা-মার তেমন খোঁজখবর রাখতে পারে না, তবে মাঝে মধ্যে টুকটাক ওষুধপাতি কিনে দেয়। ঘরের অবস্থা খুবই খারাপ। ঝড়-বাদল আইলে অনেক সময় আমাদের ঘরে ডাকি, কিন্তু লজ্জা বা সংকোচে আসতে চায় না। কেউ যদি ওনাদের একটা ঘর করে দেয় বা সরকার থেকে পায়, তবে অনেক উপকার হতো।”
এই বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউসার হামিদ জানান, “এই মুহূর্তে সরকারিভাবে টিনের বরাদ্দ নেই। আগামী জুন মাসে নতুন বরাদ্দ আসবে। ওই পরিবারের সদস্যরা যদি একটি লিখিত আবেদন করেন, তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের সহায়তা করা হবে।”
ঝড়, বৃষ্টি আর তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচতে এখন একটি টেকসই ঘরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন পলিথিনে মোড়ানো এই বৃদ্ধ দম্পতি।
এইমাত্র পাওয়াঃ
আজকের শিরোনামঃ
ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো: পলিথিন আর গোলপাতার ঝুপড়িতে হালিমা-হাবিবের ৩০ বছর
জনপ্রিয় সংবাদ










